
শহরের দুই প্রান্তে দুটো জানালা জ্বলত রাত বারোটার পর। একটা পূর্ব দিকের ছ’তলার বারান্দা, যেখানে রায়ান সিগারেট ধরাত আর নিচের রাস্তায় তাকিয়ে হলুদ আলো গুনত। অন্যটা পশ্চিম দিকের তিনতলার ঘর, যেখানে মেহরিন গিটারটা কোলে নিয়ে একটানা একই সুর বাজাত—ভাঙা, অসম্পূর্ণ।থেকে থেকে থেমে থেমে। মনে হতো কারো হৃদয়ের করুন কান্না ভেঙ্গে ভেঙ্গে রাত্রীর নিস্তব্ধতাকে খান খান করে তুলছে।
ওদের দেখা হয়েছিল একবারই, কলেজের শেষ দিনে, লাইব্রেরির সিঁড়িতে। বৃষ্টি পড়ছিল। মেহরিনের হাত থেকে বই পড়ে গিয়েছিল, রায়ান তুলে দিয়েছিল। চোখাচোখি হয়েছিল তিন সেকেন্ড। ব্যাস। নামও জানা হয়নি।
তারপর জীবন ওদের টেনে নিয়ে গেল দুই দিকে। রায়ানের বিয়ে ঠিক হল বাবার ব্যবসার পার্টনারের মেয়ের সাথে—চুপচাপ, নিশ্চিত, নিরাপদ। মেহরিন চলে গেল চট্টগ্রামে, মায়ের অসুখ, ছোট ভাইয়ের স্কুল—দায়িত্বের পাহাড়।
কিন্তু সেই তিন সেকেন্ড ওদের ছাড়ল না।
রায়ান প্রতি রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভাবত, “ওই মেয়েটা এখন কী করছে? ওর গলার স্বর কেমন?” মেহরিন গিটারে সেই অসম্পূর্ণ সুর বাজাতে বাজাতে ভাবত, “যে ছেলেটা বই তুলে দিয়েছিল, সে কি এখনো বৃষ্টি দেখলে থেমে যায়?”
ওরা কখনো ফেসবুকে খোঁজেনি, নাম্বার চায়নি। কারণ দুজনেই জানত—খুঁজে পেলেও ধরে রাখা যাবে না। রায়ানের ঘরে বউ অপেক্ষা করবে, মেহরিনের ঘরে মায়ের ওষুধের বিল। তারা তো নিজেরা জানতো নিজেদের জীবনের মেরুকরণ। রায়ানদের জীবনে আসে সোসাইটি গার্ল। পারিবারিক চাওয়া কে মূল্য দিতে হয়। প্রেম ভালোবাসা সম্পর্কের মানদণ্ড নয়। এই সমাজে পিতার ইচ্ছেই সবকিছু। আর মেহরীণদের মত ছাপোষা জীবনে আঙ্গুলের কড়ে গুণে সংসার। আর সবই স্বপ্ন বিলাস।
পাঁচ বছর পর একটা বইয়ের দোকানে আবার দেখা। রায়ান হাতে কফির কাপ, পাশে স্ত্রী। মেহরিন হাতে প্রেসক্রিপশন, চোখের নিচে কালি। আবার তিন সেকেন্ড। এবারও নাম জানা হল না। শুধু মেহরিনের আঙুল কেঁপে উঠল, রায়ানের কফি ছলকে পড়ল।
কেউ কারো দিকে এগোল না।
রাতে দুটো জানালাই জ্বলল আবার। রায়ানের সিগারেট দ্রুত শেষ হল, মেহরিনের সুরটা আরেকটু ভাঙল।
ভালোবাসা ওদের হয়েছিল—তীব্র, নিঃশব্দ, দহনের মতো। যে আগুন আলো দেয় না, শুধু ভেতরে পোড়ায়। আর ওরা দুজনেই সেই আগুন পুষে রেখেছিল সারা জীবন, কখনো নিভাতে চায়নি, কখনো ছুঁতেও পারেনি।
কারণ কিছু ভালোবাসা পাওয়ার জন্য আসে না—শুধু মনে করিয়ে দিতে আসে, মানুষ কতটা পুড়তে পারে, বেঁচে থেকেও।