
সে আজ অনেক দিনের কথা আমরা তখন ভারত ও
বাংলা দেশের সীমান্ত শহর বেনাপোলে থাকি l
আমি তখন ক্লাস Vl এর ছাত্র, বাবা বেনাপোল স্কুলের
হেডমাস্টার ছিলেন সেই সুবাদে আমরা ওখানকার
জমিদার বাড়ির একাংশে ও অপর পার্শে স্বয়ং নায়েব
মশাই থাকতেন l আমরা 4 ভাই বোন/মা, বাবা ও
আমাদের পরম প্রিয় ঠাকুরমা এই বাড়িতে থাকতাম ll
নায়েব দাদু বেশ স্থূলকায় ছিলেন, দুজন দারোয়ানের
কাঁধে ভর দিয়ে উনি চেয়ারে বসতেন এবং উঠতেন l
জমিদার বাড়ি বলে কথা, প্রায় 100 বিঘার মতো
জমি নিয়ে এর সীমানা ছিলো l মহলের প্রবেশ পথেই
ছিলো এক মস্ত সরোবর l ছোট/বড়ো বিভিন্ন ধরণের
মাছেরা এই জলে খেলা করতো নিশ্চিন্ত মনে l
ঘাটে সান বাঁধানো ছিলো, আমরা সবাই এখানে স্নান
করতাম l বিকালে এই ঘাটের পাড়ে বসে সুন্দর
প্রকৃতিটাকে দেখতাম l বড়ই সুন্দর ছিলো সূর্যাস্তের
সেই ক্ষণকাল l পাশেই ছিলো সুন্দর শিব মন্দির ll
গ্রীষ্মের ছুটিতে অলস অপরাহ্নে এসে এই মাছেদের
খেলা দেখতাম l মন টা আনন্দে ভরে যেতো l
কেউ বা ঘাটের পাড়ে এসে খাবার খুঁজতো কেউ বা
আবার গভীর জলে মাঝে, মাঝে ঘাই মারতো l
পুঁটিমাছেরা ঝাঁক বেঁধে আসতো, আবার একটু শব্দ
পেলেই কোথায় পালিয়ে যেতো l চিংড়ি রা আবার
পা দিয়ে পিছন পানে এগুতো, কি বিচিত্র সব জীব
জগতের খেলা l
পড়ন্ত বিকালে ওদের গায়ের সেই রঙীন আভা আমার
মনে এক অনাবিল আনন্দ এনে দিতো l যারা এই
দৃশ্য দেখেছেন তারাই এটা বুঝতে পারবেন l
ভাষায় সেটা বর্ণনা করা খুবই দুঃসাধ্য ll
যাইহোক, এইভাবেই ছুটিটা বেশ উপভোগ করছিলাম
এবার একটা দিনের একটি ঘটনা বলি—যেটা আমি
আজও ভুলতে পারি নাই ———
সেদিন একটু সকাল, সকালই ছিপ ও টোপ নিয়ে
ঘাট পাড়ে গিয়ে বসে ছিলাম l বেশ কয়েকটা পুটি মাছ
ধরেছি, এমন সময় দেখি একটা ল্যাটা মাছ এক ঝাঁক
ছানা/পোনা নিয়ে ঠিক ঘাট পাড়ে এসে আমার
সামনে দিয়ে বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরছে l ঠিক যেন
গড়ের মাঠে বা কোন নির্জন উদ্দানে মা তার শিশুদের কে
নিয়ে হাওয়া খেতে বেরিয়েছেন l সেদিন আমার কি
মনে হলো আমি নিজেকে সংযত করতে পারলাম না l
আমি ছিপটা নিয়ে টোপ শুদ্ধু ঐ মা ল্যাটার সামনে
নাচাতে লাগলাম l একটু বাদেই ও এসে যেই গিলেছে
ওমনি এক টানতে ডাঙায় তুলে নিয়ে এলাম ll
আমি তো মহা খুশী, আজ নতুন শিকার, ল্যাটা
ধরেছি l কিন্তু আমার সেই আনন্দ ছিলো ক্ষনিকের মাত্র,
কারণ পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখিযে সদ্য মাতৃ হারা
শিশুরা (পোনারা )তাদের মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে l
আমার মনে হোলো ওরা সবাই নিশ্চয় ওর মা কে
না পেয়ে অনাথ শিশুদের মতো বৃথাই মায়ের
অনুসন্ধান করছে l এই সব আমার মনের মধ্যে
তোলপাড় করতে থাকলো, আমি ছোট হলেও
এই অনুভূতি শক্তিটা আমার জন্মগত ছিলো l
এখন সেটা বুঝতে পারি l যাইহোক, আমি আর
সেই বিবেক যন্ত্রনা সহ্য করতে পারছিলাম না l
তাড়াতাড়ি গিয়ে জলে ছেড়ে দিলাম ওকে, ওমনি মা
যেই জলের শব্দ করেছে সব পোনা এক ছুটে
মায়ের কোল ঘেঁষে এসে ঝাঁপিয়ে পড়লো ll
ঐ বয়সেও আমি স্পষ্ট অনুভব করতে পারলাম
মা মাছ টি আমাকে প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করতে
করতে অনেক দূরে ছানা দের নিয়ে চলে গেলো l
আমি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলাম, শুধুই ক-ফোঁটা আনন্দাশ্রু
আমার বুকে ঝরে পড়লো l
এটা আমার সেই ছেলেবেলার একটা ছোট্ট ঘটনা মাত্র
কিন্তু আমি সেটা আজও ভুলতে পারলাম না কেন?
এটাই ছিলো আমার আজকের গল্প কথা —–
সবার কেমন লাগলো জানালে খুশী হবো এবং
এই রকম আরও ছোট ঘটনা যেটা আমার জীবনে
ঘটেছে সেগুলো জানাবার ইচ্ছা রইলো ll
সকলের মঙ্গল কামনা করি এবং সকলকে
আমার আন্তরিক অভিনন্দন জানাই—
,