একুশ যায় একুশ আসে। ফাগুন হাসে। প্রকৃতি ভাসে নানা বর্নে নানা ছন্দে। বসন্ত বিলাসে চারদিকে কেমন এক মূর্চ্ছনা। মনের মাঝেও জল তরঙ্গ বাজে। গাছের ছায়ায় বসা কিছু মানুষ হয় আনমনা। রৌদ্রজ্বলা একটা দিন শুরু হয় বসন্ত বাতাসের পরশ নিয়ে।
বায়ান্ন সাল। এমন এক বসন্ত দিনে ফাগুন বাতাস ভারী হয়ে ওঠে রাইফেল, মর্টার, মেশিনগানের বিষ্ফোরকে। আকাশ বাতাস কেঁদে ওঠে প্রাণের দীর্ঘশ্বাসে, আর্তনাদে।একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে আমার যা কিছু আবেগ, যা কিছু অনুভব, দিনটির প্রতি যে শ্রদ্ধাবোধ। তা আমি অর্জন করেছি আমার শৈশবে। আর যে মানুষটি আমাকে এই দেশ, আর ভাষার মূল্যবোধ সম্পর্কে বীজ বপন করেছেন তিনি আমার শৈশবের শিক্ষাগুরু তালেব আলী স্যার। এ জীবনে যা কিছু, যতটুকু অর্জন তার গোড়াপত্তন করেছিলেনও ঐ মানুষটি। কোথায় আছেন, কেমন আছেন বেঁচে আছেন কিনা কিছুই জানিনা। শুধু জানি আমার জীবন পথে একান্তই যে আমি,সেই আমার ভূবনে শ্রদ্ধাবনত হয়ে স্মরণীয় আছেন তিনি । নতুন বছর। দুই হাজার ছাব্বিশ এসে গেছে। আজ একুশে ফেব্রুয়ারি ( বাংলা ফাল্গুন মাস) প্রকৃতিতে বসন্তের আমেজ। ফাগুনে আগুন ঝরা ফুলে ফুলে ভরা চারপাশ। আমাদের মাতৃভাষার অধিকার অর্জনের মাস। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনে শহীদ ছাত্র জনতার কথা, সেই শিশু বয়সে প্রথম আমার শিক্ষাগুরুর কাছেই জানতে পারি। পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে বলতেন তাঁদের কথা। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসক চাপিয়ে দিয়েছিল বাংলা ভাষাভাষিদের উপর তাদের উর্দু ভাষা। এটাই নাকি জাতীয় ভাষা, মাতৃভাষা। পাকিস্তানি দের এই চিন্তা তৎকালীন পূর্ববাংলার জনমনে, জনগণের কলিজায় আঘাত হানে। ফেটে পরে বীর বাঙ্গালী। প্রতিবাদে প্রতিবাদে মুখর হয় , শহর গ্রাম গন্জ। বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকার কেড়ে নেবে! যে বাঙ্গালী বাংলায় কথা বলে নিজেকে খুঁজে পায়। সেই ভাষায় কথা বলা যাবে না। বাংলার মানুষের অস্তিত্বে আঘাত আসে। তাই অধিকার আদায়ের মরণপণ সংগ্রাম শুরু হয়। শ্লোগানে শ্লোগানে মুখর হয় রাজপথ।
"আমার ভাষা তোমার ভাষা
বাংলা ভাষা বাংলা ভাষা"
'রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই বাংলা চাই '
নিজের ভাষায় কথা বলার অধিকারের কথা বলতে যেয়ে, রাজপথ হলো সেদিন রক্তলাল। গুলিতে ঝাঁঝরা হল তারুণ্য। লুটিয়ে পড়ল প্রশস্ত রাজপথে সালাম রফিক বরকত শফিউর আরও কত অজ্ঞাত কিশোর যুবকের দেহ। পথের পাশের শিমুল পলাশ আরও লাল হলো_ তাজা প্রানের তাজা রক্তে। ঐ রক্তদিন, অধিকার আদায়ের দিন, ভাষার জন্য জীবন দেয়ার দিন, বাঙ্গালী ভোলেনি। ভুলবেনা কোনদিন। একুশ আসে একুশ যায়। বুকের রক্তক্ষরণ বন্ধ হয় না।
আমি শত ব্যস্ততার মাঝেও আপন ভূবনের অলিগলিতে হাতরে ফিরি এইসব স্মৃতিকথা। একুশ শুধু একটি দিন বা তারিখ নয়। একুশ আমাদের অস্তিত্ব। আমরা ভুলতে পারিনি সালাম রফিক বরকত শফিউরদেরকে। ভুলতে পারিনি আরও কত অজ্ঞাত কিশোর যুবক যারা সেদিন বুলেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে বলিদান হল। আমরা ভুলতে পারিনা সেই একুশের বীর শহীদদেরকে। প্রতি বছর প্রতি ফাল্গুন শিমুল পলাশ রক্তলাল হয়ে ফোটে। বসন্ত বাতাসে উড়ে উড়ে শ্রদ্ধা জানায় শহীদ মিনারের পাদমূলে। আমার শৈশবের সেই বোধ কৈশোর যৌবনে থেকে আজ পযর্ন্ত আমাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। একুশের সেই ভোর, সেই মাহেন্দ্রক্ষনের জন্য আধো ঘুম আধো জাগরণে অপেক্ষা করতাম, কখন ভোর হবে। পথের পাশেই বাড়ি। কখন আসবে প্রভাতফেরি। সেই শিশুকাল থেকেই শুনে আসছি। ভোরের আযানের কিছু পরেই ভেসে আসতো পরম চাওয়া সেই সুর
" আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি,আমি কি ভুলিতে পারি
ছেলে হারা শত মায়ের অশ্রু
গড়া এ ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারিআবালবৃদ্ধবনিতা,ছাত্র জনতা, ভাই বন্ধু সবাই ব্যথাতুর হৃদয়ে, খালিপায়ে এগিয়ে চলেছেন।আমি মায়ের হাত ধরে মিশে যেতাম সেই জনতার সমুদ্রে।যৌবনের সেই মশাল বুকের মাঝে আজও জ্বলছে।। জোনাকির আলোর মত জ্বলেই চলেছে টিপটিপ টিপটিপ করে, শিখা চিরন্তন।মনের বাতিঘরে এভাবেই আমি ঘুরে বেড়াই জীবনের পড়ন্ত দিনেও। অস্তিত্বের শিখা প্রজ্বলিত রাখার মত বড় কাজ কি আর আছে।সময় পাল্টিয়েছে। জীবন এখন বড়ই সংঘাতময়। তবুও কান পেতে আছি প্রভাতফেরির জন্য। বছরের পর বছর ধরেই কান পেতে থাকি, অপেক্ষায় থাকি ওরা আসবে চুপিচুপি। আসবে শিমুল পলাশ গুলালে। ফুল পাখির কলরবে। বসন্ত বাতাসে। ওরা আছে হৃদয়ের শ্রেষ্ঠ সম্পদ হয়ে।